বিনা পারিশ্রমিকে ১০ হাজার মানুষকে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন ‘হাফেজ হান্নান’

217

কোনো ধরণের পারিশ্রমিক গ্রহণ না করে মানুষকে কোরআন শিক্ষা দেয়াই তার পেশা। নিজের তেমন কোনো জমি না থাকলেও বাবার থেকে প্রাপ্ত এক কাঠা জমির ওপর নিজের অর্থেই গড়ে তুলেছেন মক্তব ঘর।

প্রভাতের আলো ফুটে উঠতেই প্রতিদিন সেখানে কোরআন শিক্ষা দেন তিনি। কুষ্টিয়ার মিরপুর পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড সুলতানপুর গ্রামে নীরবে-নিভৃতে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মানুষকে কোরআন শিক্ষা দিচ্ছেন হাফেজ আবদুল হান্নান।

হাফেজ আবদুল হান্নান জানান, ১৯৮৪ সালে সর্বপ্রথম বাড়ির উঠানে গ্রামের ছেলেমেয়েদের কোরআন শেখানো শুরু করেন। এরপর ব্যাপক হারে শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়ায় ১৯৮৬ সালে বাড়ির পাশে রাস্তার ধারে একটি মাটির ছাপড়াঘর তৈরি করে সেখানে কোরআন শিক্ষা অব্যাহত রাখেন।

পরে ১৯৯৫ সালে বাবা মৃ”ত আবদুল আজুজ শেখ তাকে এক কাঠা জমি দিলে সেখানে একটি ঘর নির্মাণ করে কোরআন শিক্ষা দেন।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত নিজের গ্রাম ছাড়াও আশপাশের এলাকার প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন।

হাফেজ আব্দুল হান্নান বলেন, আমি নিজে কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেছি। কোরআন শিক্ষাগ্রহণের সময় আমাদের শিক্ষক শিখিয়েছিলেন ‘যে নিজে কোরআন শিক্ষাগ্রহণ করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয় সে রাসূল (সা.)-এর কাছে উত্তম ব্যক্তি’।

আমি তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নেই মানুষকে বিনা খরচে কোরআন শিক্ষা দেব। তাই আমি এখন পর্যন্ত করে যাচ্ছি, এবং যত দিন বেঁচে থাকব তত দিন কোরআন শিক্ষাদানের এই মহান কাজটি করে যাব।

তিনি আরও বলেন, আমার মক্তবে বিভিন্ন বয়সের মানুষ কোরআন শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তাছাড়াও যেসব শিক্ষার্থীর কোরআন শরিফ কেনার সামর্থ্য নেই তাদেরকেও বিনামূল্যে কোরআন শরিফ দেয়া হয়।

আবদুল হান্নান জানান, তিনি স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করেন। এর জন্য তাকে বছরে বিশ মণ ধান দেওয়া হয়। তার আয় বলতে এতটুকুই। নিজের দুই বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে সংসার চালিয়ে নেন।

তিনি আরও জানান, সুলতানপুর, বাজারপাড়া, মুশারফপুর, গোবিন্দগুনিয়া এলাকার কোনো পুরুষ মানুষ মা”রা গেলে তিনি নিজ হাতে তাকে গোসল এবং কা’ফ’ন-দা’ফ’ন করেন। এর জন্য তিনি কারও থেকে পারিশ্রমিক দাবি করেন না।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ : যার তেলাওয়াত শুনে কাঁদতেন বিশ্বনবি (সা.)

কুরআন আল্লাহর কিতাব। আল্লাহ তাআলা এ কিতাব দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিশ্বমানবতার কল্যাণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাজিল করেছেন।

সাহাবায়ে কেরাম এ কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ধারক ও বাহক। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু। যার তেলাওয়াত শুনলেই বিশ্বিনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাঁদতেন।

সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়ে বহন করা কুরআন আজো অক্ষত অবিকৃত অবস্থায় বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর কাছে বিরাজমান। তারা ছিলেন কুরআনের একান্ত অনুরাগী। কুরআনের ভাব-মর্মে তাদের ঈমান বেড়ে যেত।

তাদের তেলাওয়াতে অস্রুসিক্ত হতো মুমিন মুসলমান। এসব সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তুলে ধরা হলো তার সংক্ষিপ্ত পরিচয়-

বিশ্বনবির হিজরতের ৩৭ বছর আগে পবিত্র নগরী মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রায়িাল্লাহু আনহু। ইসলাম গ্রহণের তালিকায় তার নাম ৬ নম্বরে। তিনি বদর, ওহুদ, খন্দক, বায়আতে রেদওয়ানসহ অনেক যু.. দ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

আল্লাহর রাসুলের প্রিয় সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কুরআনের সাধক হিসেবে আজো বিশ্ববিখ্যাত। তার ব্যাখ্যা এবং মতামত এখনো সবার শীর্ষে গ্রহণযোগ্য। তিনি ছিলেন কুরআনুল কারিমের একনিষ্ঠ সেবক ও গবেষক। জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় তিনি কুরআন গবেষণায় ব্যয় করেছেন। হয়েছেন রইসুল মুফাসসিরিনদের একজন।

ইতিহাস সাক্ষী, কটু কথা ও নির্যাতনকে উপেক্ষা করে অসীম সাহসী কুরআনের সাধক আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কাবা শরিফে সুরা আর-রাহমানের কিছু অংশ তেলাওয়াত করে হিংস্র কুরাইশ নেতাদের হতবাক করে দেন। হিজরতে আগে মক্কার কঠিন পরিস্থিতিতে বিশ্বনবির পর তিনিই সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে পবিত্র কুরআনুল কারিম তেলওয়াত করেন।

হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারিতে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ নিজেই বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে কুরআন তেলাওয়াত করতে বলতেন এবং তাঁর তেলাওয়াত শুনে তিনি অস্রুসিক্ত হতেন।’

বিশ্বনবি তাঁর তেলাওয়াতের প্রশংসা করে বলতেন, ‘কুরআন যেভাবে নাজিল হয়েছে ঠিক তেমন ও সুন্দরভাবে তেলাওয়াত করে খুশি হতে চায়, সে যেন ইবনে উম্মে আবদ (অবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ)-এর মতো কুরআন তেলাওয়াত করেন।’ (মুসনাদে আহমদ)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সাহাবাদেরকে) তাঁর কাছ থেকে কুরআন শেখার নির্দেশ দিতেন।’ (বুখারি)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বিশ্বনবির ঘরেই লালিত-পালিত হন। তাঁকে অনুসরণ করে জীবনাচার ও চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করেন। এ কারণেই বিশ্বনবি বলতেন- ‘হেদায়াত প্রাপ্তি, আচার-আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তিনিই (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ) হচ্ছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে নিকটতম উত্তম ব্যক্তি।’

তিনি বিশ্বনবির শিক্ষালয়ে শিক্ষা লাভ করেন। এ কারণেই সাহাবিদের মধ্যে যারা কুরআনের সবচেয়ে ভালো পাঠক, ভাব ও অর্থের সবচেয়ে বেশি বুঝদার এবং আল্লাহর আইন ও বিধি-বিধানের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ, তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন।