বদনজরের সত্যতা আছে? বদনজর কিভাবে লাগে? বাঁচার আমল

359

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নজর লাগা সত্য। (মুসলিম)

মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নানা রকম হয়ে থাকে। কেউ ভালো নজরে দেখে, আর কেউ হিংসাত্মক দৃষ্টিতে তাকায়।

অনেক সময় দেখা যায়, ভালো কোনো জিনিসের প্রতি মানুষের বদনজর লেগে যায়। খারাপ নজর লাগলে— নজরকৃত ব্যক্তি বা জিনিস ক্ষতি ও অনিষ্টের সম্মুখীন হয়।

বদনজরকে কুদৃষ্টি বা অশুভ দৃষ্টিও বলা হয়। বদ নজরের এই প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নিতান্ত সত্য। ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা এ বিষয়ে একমত যে ‘চোখ লাগা’ এবং এর মাধ্যমে ক্ষতিসাধিত হওয়া প্রমাণিত সত্য।

তাই কারো ক্ষেত্রে বদনজর বা কুদৃষ্টি লেগে গেলে, এই বিশ্বাস রাখতে হবে— এই দৃষ্টিশক্তির মধ্যে এমন ক্ষমতা (খারাপ) মহান আল্লাহই দান করেছেন। তাই মানুষের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা করা, তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।

কোরআন-হাদিসে বদনজরের বিষয়

পবিত্র কোরআনেও কয়েক জায়গায় বদ নজরের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কাফেররা যখন উপদেশবাণী শোনে তখন তারা যেন তাদের দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছড়ে ফেলবে, আর তারা বলে, এ তো এক পাগল’। (সুরা কলম, আয়াত : ৫১)

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আয়াতে ‘তাদের দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছড়ে ফেলবে’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘তোমার প্রতি বদ নজর দেবে।’

অর্থাৎ তারা তোমাকে হিংসার প্রতিফলন ঘটিয়ে রোগী বানিয়ে দেবে, যদি আল্লাহর তোমার প্রতি হেফাজত না থাকে। আয়াতটি প্রমাণ বহন করে যে, বদ নজরের কুপ্রভাবের বাস্তবতা রয়েছে, আল্লাহর হুকুমে। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪/৪১০)

কারো প্রতি দৃষ্টি দিয়ে আল্লাহর নাম না নিয়ে বা তার জন্য বরকতের দোয়া না করে যখন গুণ বর্ণনা করা হয়, তখন সেখানে উপস্থিত শয়তানি আত্মাগুলো তার এ দৃষ্টি ও বরকতহীন গুণের কথাগুলো লুফে নিয়ে তার সঙ্গে ঢুকে পড়ে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় এবং তার মধ্যে প্রতিরক্ষার কোনো ব্যবস্থা না থাকলে বদনজরের কুপ্রভাব দেখা দেয়।

বদনজরের চিকিৎসা

দুইভাবে বদনজরের চিকিৎসার করার পদ্ধতি এসেছে হাদিসে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদনজরের চিকিৎসা ও করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাহলো-

বদনজরকারী ব্যক্তি যদি পরিচিত হয়, বা তাকে চেনা যায় তবে তাকে গোসল করার নির্দেশ দিতে হবে। আর বদনজরকারী ব্যক্তির উচিত হলো- আল্লাহ ও তার রাসুলের অনুসরণ করে গোসল করা।

অতঃপর বদনজরকারী ব্যক্তির গোসলের পানি আক্রান্ত ব্যক্তির পেছন থেকে তার শরীরের ওপর ঢেলে দেওয়া। আল্লাহর ইচ্ছায় আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে যাবে। 

হাদিসে এসেছে- হজরত আবু উমামাহ বিন হুনাইফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমির বিন রাবিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহল বিন হুনাইফ রাদিয়াল্লাহুর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তখন গোসল করছিলেন।

আমির বিন রাবিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি এমন খুবসুরত সুপুরুষ দেখিনি; এমনকি পর্দানশীন নারীকেও এরুপ সুন্দর দেখিনি, যেমন আজ দেখলাম।

অতঃপর কিছুক্ষণের মধ্যেই সাহল রাদিয়াল্লাহু আনহু বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তাকে বলা হলো- ধরাশায়ী সাহলকে রক্ষা করুন।

তিনি (রাসুলুল্লাহ) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কাকে অভিযুক্ত করছো? তারা বললো, আমির বিন রাবিয়াহকে।
তিনি বলেন, তোমাদেরকেও বদনজর লাগিয়ে তার ভাইকে কেন হত্যা করতে চায়? তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের মনোমুগ্ধকর কিছু দেখলে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে।

অতঃপর তিনি পানি নিয়ে ডাকলেন অতঃপর আমির বিন রবিয়াহকে অজু করতে নির্দেশ দিলেন। তিনি তার মুখমণ্ডল, দুই হাত কনুই পর্যন্ত, দুই পা টাখনু পর্যন্ত ও লজ্জাস্থান ধুয়ে নিলেন।

তিনি (রাসুলুল্লাহ) আমিরকে পাত্রের (অবশিষ্ট) পানি সকলের উপর ঢেলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি সাহলের পেছন দিক থেকে পানি ঢেলে দেওয়ার জন্য আমিরকে নির্দেশ দেন। (ইবনে মাজাহ)

হজরত আবু উমামা ইবনে সাহল ইবনে হুনাইফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, তার বাবা তাকে বর্ণনা করেছেন, মক্কার পথ অতিক্রম করার সময় তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। সাহলকে বদনজর লাগালে তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো।

বলা হলো- হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি সাহল সম্পর্কে জানেন? আল্লাহর শপথ! সে মাথা ওঠাতে পারছে না এবং জ্ঞানও ফিরছে না।

তিনি বললেন, তোমরা কি কাউকে সন্দেহ করছ যে, যার বদনজর লেগেছে?

তারা বলল, হ্যাঁ, তার দিকে আমর ইবনে রবিয়াহ নজর দিয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম আমেরকে ডেকে তার ওপর রাগ করে বললেন, ‘তোমাদের কেউ তার ভাইকে কেন হত্যা করছ? যা দেখে তোমাকে আশ্চর্য করে, তার জন্য বরকতের দোয়া করলে না কেন?

তারপর তিনি তাকে বললেন- তার জন্য তুমি গোসল কর। অতঃপর সে তার মুখমণ্ডল, উভয় হাত কনুইসহ, হাটুদ্বয়, লজ্জাস্থান একটি পাত্রে ধুয়ে নিল। তারপর সে পানিগুলো সাহলের ওপর ঢেলে দেওয়া হলো।

একজন তার পেছন থেকে মাথা ও পিঠের ওপর পানি ঢালবে। অতঃপর সে (পানির) পাত্রটি বার বার মাটিতে উপুড় করে দেবে। এরূপ করার পর সাহল সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে সবার সঙ্গে যেতে লাগলো। (মুসনাদে আহমাদ)