স্কুলছাত্রীর কাছে ‘হিরোইজম’ দেখাতে শিক্ষক উৎপলের ওপর হামলা

আশুলিয়ার হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যার দায়ে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী আশরাফুল আহসান জিতু ওরফে জিতু দাদাকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

র‍্যাব জানায়, শিক্ষকতার পাশাপাশি শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন উৎপল কুমার সরকার।

সে হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম, চুলকাটা, ধূমপান, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন শৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত বিষয়গুলো দেখভাল করতেন।

স্কুলের এক ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অযাচিতভাবে ঘোরাফেরা করত দশম শ্রেণির ছাত্র আশরাফুল আহসান জিতু। এই অযাচিতভাবে ঘোরাফেরা থেকে জিতুকে বিরত থাকতে বলেছিলেন শিক্ষক উৎপল।

আরও জানায়, এ ঘটনায় জিতু ক্ষুব্ধ হয়ে ওই ছাত্রীর কাছে নিজের হিরোইজম দেখাতে জন্য শিক্ষক উৎপলের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে।

সে অনুযায়ী গত ২৫ জুন স্কুলে ছাত্রীদের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলাকালে উৎপলকে স্ট্যাম্প দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে আহত করে জিতু। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিক্ষক উৎপল মারা যান।

ঘটনার পরপরই জিতু দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করেন। এরপর বুধবার (২৯ জুন) র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র‍্যাব-১ ও র‍্যাব-৪ এর যৌথ অভিযানে গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকা থেকে আশরাফুল আহসান জিতু ওরফে জিতু দাদাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুন) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

জিতুকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার কয়েকদিন আগে স্কুলের এক ছাত্রীর সঙ্গে অযাচিতভাবে ঘোরাফেরা করছিল জিতু।

শিক্ষক উৎপল তাকে অযাচিত ঘোরাফেরা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে প্রেষণা দেন। এ ঘটনায় জিতু তার শিক্ষকের প্রতি ক্ষুব্ধ হয় এবং ওই ছাত্রীর কাছে নিজের হিরোইজম প্রদর্শন করার জন্য তার (শিক্ষক) ওপর হামলার পরিকল্পনা করে।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৫ জুন ক্রিকেট স্ট্যাম্প স্কুলে নিয়ে আসে এবং তা শ্রেণি কক্ষের পেছনে লুকিয়ে রাখে জিতু।

পরবর্তীতে কলেজ মাঠে ছাত্রীদের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলাকালে শিক্ষক উৎপল কুমারকে মাঠের এক কোনে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিতু স্ট্যাম্প দিয়ে অতর্কিতভাবে বেধড়ক আঘাত করতে থাকে।

জিতু শিক্ষক উৎপলকে প্রথমে পেছন থেকে মাথায় আঘাত করে এবং পরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে গুরুতরভাবে জখম করে। যার ফলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন উৎপল কুমার মারা যান।

খন্দকার আল মঈন বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত জিতু এলাকায় অবস্থান করলেও পরে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় এলাকা ত্যাগ করেন।

প্রথমে বাসযোগে মানিকগঞ্জে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে রাত্রিযাপন করেন। পরদিন সে তার অবস্থান পরিবর্তন করে আরিচা ফেরিঘাটে পৌঁছায় এবং ট্রলারযোগে নদী পার হয়ে পাবনার আতাইকুলাতে তার এক পরিচিতের বাড়িতে আত্মগোপন করে।

পরদিন ভোরে সে আবারও তার অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য আতাইকুলা থেকে বাসযোগে কাজিরহাট লঞ্চ টার্মিনালে এসে লঞ্চযোগে আরিচাঘাট পৌঁছায়।

সেখান থেকে বাসযোগে গাজীপুরের শ্রীপুরে ধনুয়া গ্রামে এক বন্ধুর বাড়িতে আত্মগোপনে যায়। সেখান থেকেই জিতুকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

গ্রেপ্তার জিতুর বিষয়ে তিনি বলেন, সে শিক্ষাজীবনে বিরতি দিয়ে প্রথমে স্কুল পরে মাদ্রাসা ও সর্বশেষ পুনরায় স্কুলে ভর্তি হয়। জিতু ওই স্কুলে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে বর্তমানে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

স্কুলে সবার কাছে একজন উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, মারামারিসহ স্কুলের পরিবেশ নষ্টের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ও স্কুল চলাকালে ছাত্রীদের ইভটিজিং ও বিরক্ত করত জিতু। স্কুল প্রাঙ্গণে সবার সামনে ধূমপান, স্কুল ইউনিফর্ম ছাড়া স্কুলে আসা-যাওয়া, মোটরসাইকেল নিয়ে বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করত।

জিতু তার নেতৃত্বে এলাকায় ‘জিতু দাদা’ নামে একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলে। গ্যাং সদস্যদের নিয়ে মাইক্রোবাসে করে যত্রতত্র আধিপত্য বিস্তার করত। পরিবারের কাছে তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে জিতু তার অনুসারী গ্যাং সদস্যদের নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হতো।

জিতুর জেএসসির সার্টিফিকেট অনুযায়ী তার বছর ১৯ বছর। কিন্তু মামলার এজাহারে তার বয়স ১৬ উল্লেখ করা হয়েছে বলেও জানান র‌্যাবের এ কর্মকর্তা।

খন্দকার আল মঈন বলেন, নিহত শিক্ষক উৎপল কুমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ২০১৩ সালে আশুলিয়ার হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

তিনি ওই কলেজের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর ফলে তিনি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের স্কুল ইউনিফর্ম, চুলকাটা, ধূমপান করা ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত বিষয়ে প্রেষণা প্রদান করতেন।

এছাড়া তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলাধুলা পরিচালনাসহ শিক্ষার্থীদের সুপরামর্শ, মোটিভেশন ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সৃজনশীলতা বিকাশে ভূমিকা রাখতেন।

জিতুর বাবাকে গ্রেপ্তারের পর তাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খন্দকার আল মঈন বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করে করেছে তদন্তের স্বার্থে তাকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন, তাই জিতুর বাবাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছেন।

আমরা জিতুকে গ্রেপ্তারের আগে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।র‌্যাব প্রকৃত আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে চেষ্টা করে সবসময়। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা প্রকৃত আসামি জিতুকে গ্রেপ্তার করে আইনের কাছে সোপর্দ করেছি।

জিতুর পরিবার কর্তৃক উৎপলের পরিবারকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা উৎপলের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু এমন কোনো হুমকি-ধমকির বিষয়ে তথ্য পাইনি।