৪৫ মণের মানিকে সর্বস্বান্ত শিক্ষার্থী হামিদা

দেখতে অনেকটা দানবের মতো। বয়স ৫ বছর। ওজন হয়েছে ৪৫ মণ। শখ করে ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড়টির নাম রাখেন মানিক। সংসারের সর্বস্ব দিয়ে মানিককে বড় করে তুলেছেন। কিন্তু ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।

ঈদের আগে মানিককে বিক্রি করতে না পারলে হতাশা গ্রাস করবে স্নাতক পড়ুয়া শিক্ষার্থী হামিদা আক্তারকে।  

তরুণ উদ্যোক্তা হামিদা আক্তার টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটী ইউনিয়নের ভেঙ্গুলিয়া গ্রামের আব্দুল হামিদ ও রিনা বেগমের মেয়ে। সে করটিয়া সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অর্নাস (ইতিহাস বিভাগের) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হামিদাদের বসবাসের ঘরটি কাঁচা, জরাজীর্ণ। তবে মানিকসহ তিনটি ষাঁড়কে পাকা ঘরে রেখেছেন। হামিদা তার বাবার সহায়তায় মানিককে লালন-পালন করছেন।

মানিকও হামিদার কথা ছাড়া কারও কথা শোনে না। ষাঁড়ের দেখাশুনার পাশাপাশি বাড়ির দোকানে বসেন। সেইসঙ্গে সেলাই মেশিন দিয়ে কাজ করছেন। তার উপার্জনের সব টাকা ব্যয় করেন ষাঁড়ের পেছনে।

Dhaka post

জানা গেছে, ৫ বছর আগে বাড়ি থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে মানিকগঞ্জে ইতি নামে এক নারীর বিশাল আকৃতির ‘রাজা বাবু’ নামে ষাঁড় দেখে হামিদা সেরকম ষাঁড় পালনের স্বপ্ন দেখেন।

সেইসঙ্গে নারী হিসেবে গরুর খামার করে একজন সফল উদ্যোক্তা হতে চান। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য বাড়িতেই একটি মনিহারি দোকানে ফ্লেক্সিলোড, বিকাশ এজেন্ট ও ট্রেইলরিংয়ের কাজ করেন।

উপার্জনে বড় অংশ ব্যয় করেছেন মানিকের পেছনে। এবারের ঈদে ১৮০০ কেজি ওজনের মানিককে বিক্রির চেষ্টা করছেন। দাম হাঁকছেন ১৫ লাখ টাকা। তবে ঈদ ঘনিয়ে এলেও ষাঁড়ের আশানুরূপ ক্রেতা মিলছে না। এতে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন।

স্নাতক শিক্ষার্থী হামিদা আক্তার বলেন, পরিবারের সদস্যের মতোই মমতা দিয়ে ফ্রিজিয়ান জাতের মানিককে বড় করেছি।

গরুর ঘরে দুটি সিলিং ফ্যান আর মশারি রয়েছে। তাকে নিয়মিত খড়, ভুসি, কাঁচাঘাস, মাল্টা, পেয়ারা, কলা, মিষ্টি কুমড়া ও মিষ্টি আলু খাওয়ানো হয়। রোগ-জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করানো হয়।

তিনি বলেন, ৫ বছর আগে আমার খামারের ফ্রিজিয়ান জাতের একটি গাভি থেকে জন্ম নেয় মানিক। গত কোরবানির ঈদে গরুটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিই। তখন মানিকের ওজন ছিল ৩৫ মণ।

মানিককে ঢাকার গাবতলী হাটে উঠানো হয়। তবে করোনার কারণে হাটে নিয়েও সুবিধা হয়নি। আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় মানিককে ফিরিয়ে আনা হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন মনিককে ১৭ কেজি গমের ভুসি, ৪ কেজি ছোলা, ২ কেজি খুদের ভাত, আধা কেজি সরিষার খৈল খাওয়ানো হয়। এছাড়া দৈনিক তাকে খাওয়ানো হচ্ছে নানা জাতের পাকা কলা। 

তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন আমি একজন বড় খামারি হবো। এ বছর যদি ভালো দামে মানিককে বিক্রি করতে পারি, তবে সেই টাকায় আমি আমার স্বপ্নের খামারটি সাজাব। ওই খামারে লালন-পালন করব উন্নতজাতের সব গরু। শুরুতেই হোঁচট খেলে স্বপ্ন ভেঙে যাবে। সেক্ষেত্রে ষাঁড় পালন বন্ধ করে দুগ্ধ গাভি পালন শুরু করব।  

স্থানীয়রা জানায়, পরিবারটি খুবই দরিদ্র। মেয়েটি পড়াশোনার পাশাপাশি দোকান করে গরু লালনপালন করছে। তবে ষাঁড়টি বিশাল আকৃতির হওয়ায় ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারছে না। এতে তার খামারি হওয়ার স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

হামিদার বাবা আব্দুল হামিদ বলেন, মেয়েটা পড়াশুনা করছে। সে পড়াশুনা শেষ করার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার পর বিয়ে করবে। কিন্তু ষাঁড়টি শখের বসে লালনপালন করে এখন সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে। কেউ দামও বলছে না।

ঢাকার হাটে নিয়ে যাওয়ার মতো টাকা নেই। গত বছর গাবতলী পশুর হাটে নিয়ে গিয়েছিলাম, বিক্রি করতে পারিনি। সেবার প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়েছিল। পরে বাধ্য হয়ে মানিকের থেকে ছোট একটা গরু ক্ষতি দিয়ে বিক্রি করে বাড়ি ফেরার টাকা জোগাড় করতে হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, ঈদের আছে আর কয়টা দিন। এখনও কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাছাড়া গরুটি লালন-পালনে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে কোনো সহায়তা করা হয়নি। দেখতেও আসেনি কেউ। উল্টো বলে কেন ষাঁড়টি বড় করেছেন।

দেলদুয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. বাহাউদ্দিন সারোয়ার রিজভী জানান, এ উপজেলায় হামিদার ষাঁড়টিই সবচেয়ে বড়। প্রাণিসম্পদের অনলাইন হাটে তার ষাঁড়টির ছবি, ওজন ও দাম উল্লেখ করে বিক্রির জন্য প্রচার করা হচ্ছে।

এছাড়া আমাদের কাছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় ষাঁড় কেনার জন্য গ্রাহক যোগাযোগ করেন। আমরা সেসব ক্রেতাকেও হামিদার ষাঁড়টির বিষয়ে অবগত করব। তবে বড় ষাঁড়ের চাহিদা একটু কম। খামার করে সাবলম্বী হতে চাইলে এক-দেড় লাখ টাকা বিক্রির উপযুক্ত হলেই পশু বিক্রি করতে হবে।