অন্ধকার রাতে ১৮ কি.মি. পাড়ি দিয়ে মেয়ের লাশ থানায় নিলেন বাবা!

ঘুটঘুটে রাত। চারিদিকে কোনো যানবাহন নেই।কিন্তু যেভাবেই হোক থানায় নিতে হবে মেয়ের মরদেহ। পুলিশের পিকআপভ্যানও যাওয়ার জো নেই।

উপায় না পেয়ে নিহতের বাবার মোটরচালিত রিকশাভ্যানেই মরদেহ তুলে দেয় পুলিশ। আর কাউকে না পেয়ে অভিভাবক হিসেবে শোকার্ত বাবা নিজেই বসে পড়েন চালকের আসনে।

দুই নিকট আত্মীয়কে মেয়ের মরদেহের পাশে বসিয়ে নিজেই ১৮ কিলোমিটার ভ্যান চালিয়ে থানায় চলে যান বাবা। ঘটনাটি সোমবার (১৮ জুলাই) রাতের।

মঙ্গলবার (১৯ জুলাই) সকালে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। পরে বিকেলে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়। শোকার্ত বাবার অভিযোগ, জামাতাকে দামী স্মার্টফোন কিনে না দেওয়ায় তার মেয়েকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

তবে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বলছেন- স্বামীর ওপর অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন মেয়ে।

উভয়পক্ষের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা না করে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেছেন- মেয়ের বাবা। এতে জামাতা, মেয়ের শ্বশুর ও শাশুড়িকে আসামি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনার পর থেকে তারা সবাই পলাতক।

নিহত ওই গৃহবধূর নাম হোসনে আরা খাতুন (১৬)। সে উপজেলার যোগিপাড়া ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের ভ্যানচালক আবদুল মালেকের মেয়ে। সাত মাস আগে পাশের বীরকুৎসা গ্রামের জাহিদুল ইসলামের ছেলে রানা ইসলামের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

মেয়ের বাবা আব্দুল মালেক বাংলানিউজকে জানান, অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার কারণে এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন তিনি। বিয়ের পর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার মেয়ের সঙ্গে জামাতার অশান্তি লেগেই থাকতো।

কিছুদিন আগেও ১৭ হাজার টাকা দিয়ে তার মেয়ের স্বামীকে একটি রিকশাভ্যান কিনে দিয়েছিলেন। এরপর গত ঈদে তার মেয়ের স্বামী আবারও দামি স্মার্টফোন দাবি করেন। তিনি গরিব মানুষ হওয়ায় পরে টাকা হলে ফোন কিনে দিতে চান। এরই মধ্যে সোমবার সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়ি থেকে খবর আসে তার মেয়ে বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন।

কিন্তু তিনি মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দেখেন- ঘরের তীরের সঙ্গে একটি শাড়ি গেঁড়ো দেওয়া অবস্থায় ঝুলছে। আর তার মেয়ের মরদেহ বারান্দায় রেখে দেওয়া হয়েছে এবং তার সারা শরীরেই কালশিটে। সেই দাগ দেখে সহজেই বোঝা যায় যে সে আত্মহত্যা করেনি তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

তবে পারিবারিক অশান্তির কারণে হোসনে আরা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে তার স্বামী রানা ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে দাবি করা হয়।

এদিকে মেয়ের বাবা ও শ্বশুরবাড়ির এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিহতের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে রাত ১০টা বেজে যায় পুলিশের। ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠাতে মরদেহ থানায় নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো ভ্যান পাওয়া যাচ্ছিল না।

তখন নিজেই ভ্যান চালিয়ে মেয়ের মরদেহ রাত সাড়ে ১১টার দিকে থানায় পৌঁছে দেন বাবা আবদুল মালেক। সকালে জেলা পুলিশের মরদেহবাহী গাড়িতে করে নিহতের মরদেহ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। দুপুরে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে।

নিহতের বাবা আব্দুল মালেক বলেন, পুলিশের ভ্যান ওই বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছানোর কোনো পথ ছিল না। আর পিকআপভ্যানে যেই পুলিশ সদস্যরা গিয়েছিলেন তার মধ্যে করে মরদেহ নেওয়ারও কোনো জায়গা বা উপায় ছিল না।

তাই ওই রাতের আঁধারের মধ্যেই তিনিই মেয়ের মরদেহ নিজের ভ্যানে করে ১৮ কিলোমিটার পথ চালিয়ে থানায় পৌঁছে দেন। মেয়ের মরদেহের পাশে তার দুই আত্মীয়কে বসিয়ে দিয়েছিলেন।

তবে নিজের মেয়ের মরদেহ নিজেই ভ্যান চালিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে রাজশাহীর বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ঘটনাটি সত্য নয়।

মেয়ের বাবা ভ্যান চালিয়ে মরদেহ নিয়ে থানায় আসননি। অন্যজন ভ্যান চালিয়ে থানায় এনেছেন। বাবা আবদুল মালেক তার মেয়ের মরদের পাশেই বসেছিলেন।

আর ওই বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না থাকায় সেখানে গাড়ি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই গত রাতে ভ্যানে করে মরদেহ থানায় আনা হয়েছে বলেও দাবি করেন- বাগমারা থানার ওসি।

এ ঘটনায় থানায় আত্মহত্যার প্ররোচণার অভিযোগে থানায় একটি নিয়মিত মামলা হয়েছে। মামলায় ওই গৃহবধূর স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে আসামি করা হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকে আসামিরা পলাতক থাকায় কাউকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা যায়নি তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান বাগমারা থানার এই পুলিশ কর্মকর্তা।