‘দুনিয়া কাফেরের জন্য বেহেশত, মুমিনের জেলখানা’

জান্নাত মুমিনের চিরস্থায়ী নিবাস। দুনিয়ার প্রেমে না মজে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হতে হয় একজন মুমিনকে। অপরদিকে কাফের মুশরিকরা পরকালের পরিবর্তে দুনিয়ার সুখ-শান্তিকেই বেছে নিয়েছে।

বিশ্বনবী (স.) ইরশাদ করেছেন— الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر ‘দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফেরের জন্য জান্নাত।’ (মেশকাত: ৪৯৩১) 

দুনিয়ায় আল্লাহ তাআলা কাফের-মুশরিকদের প্রচুর ধন সম্পদ দিয়েছেন, নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব দিয়েছেন। মুমিনরা এসব দেখে বিভ্রান্ত হতে পারেন না। কেননা তাদের ধন-সম্পদ, নেতৃত্ব, খ্যাতি সব দুনিয়ার জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।

পরকালে তাদের জন্য কিছুই থাকবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এরা এমন লোক যাদের জন্য আখেরাতে আগুন ছাড়া অন্য কিছুই নেই এবং তারা যা করেছিল আখিরাতে তা নিস্ফল হবে। আর তারা যা করত তা ছিল নিরর্থক।’ (সূরা হুদ: ১৬)

দুনিয়ার সুখ শান্তিকে সেদিন অবিশ্বাসীদের কাছে খুব তুচ্ছ মনে হবে। পক্ষান্তরে মুমিনদের কাছে মনে হবে দুনিয়াতে তারা কোনো কষ্টই ভোগ করেননি। সে প্রসঙ্গটি হাদিসে উদ্বৃত হয়েছে এভাবে-

কেয়ামতের দিন অবিশ্বাসীদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে হাজির করা হবে, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়েছে। বলা হবে, তোমরা (ফেরেশতারা) একে জাহান্নাম থেকে একবার ডুবিয়ে আনো।

অতএব, তাকে জাহান্নামে একবার ডুবিয়ে আনা হবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, হে অমুক! তুমি কি কখনো সুখের ছোঁয়া পেয়েছ? সে বলবে, না, আমি কখনো সুখের ছোঁয়া পাইনি।

অতঃপর ঈমানদারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে হাজির করা হবে, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদে জীবন কাটিয়েছে। বলা হবে, একে একটু জান্নাত দেখাও। অতঃপর তাকে জান্নাত দেখানো হবে।

এরপর তাকে বলা হবে, হে অমুক! তোমাকে কি কখনো দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে? সে বলবে, আমি কখনো দুঃখ-কষ্টে পতিত হইনি।’ (ইবনে মাজাহ: ৪৩২১)

ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে যারা পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, ঔদ্ধত্য প্রকাশ করছে, সীমালঙ্ঘন করছে তারা উপলব্ধি করছে না মহান আল্লাহ ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না।

আমাদের অনেকের মনেও প্রশ্ন আসে, শিরক কুফরের কারণে অবিশ্বাসীদের ধ্বংস করা হয় না কেন? আসলে আল্লাহ তাআলার নীতি হলো তিনি অবকাশ দেন। কাউকে দীনের পথে ফিরে আসার অবকাশ দিলেও আবার কাউকে গুনাহ বেশি হওয়ার জন্যও অবকাশ দিয়ে থাকেন।

সে বিষয়টি পবিত্র কোরআনে এসেছে এভাবে- ‘কাফিররা যেন কিছুতেই মনে না করে যে আমি অবকাশ দিই তাদের মঙ্গলের জন্য; আমি তাদের অবকাশ দিই যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায়। তাদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৭৮)

তাই আমাদের আসল চিন্তা আখেরাতমুখি হওয়া উচিত। সবর করতে হবে। মিথ্যা, দুর্নীতি, হারাম খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারো অধিকার খর্ব করা যাবে না। দীনের পথে অবিচল থাকতে হবে।

ধন সম্পদ ও আরাম আয়েশের জন্য লালায়িত না হয়ে কোরআন সুন্নাহভিত্তিক জীবন যাপন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার ধন সম্পদ এবং সন্তানাদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরিক্ষাস্বরূপ।

আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন— ‘এবং তোমরা জেনে রাখো, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সন্তান শুধু এক পরিক্ষা এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট রয়েছে মহাপুরুস্কার।’ (সুরা আনফাল: ২৮)

এ কারণে রাসুল (সা.) তাঁর উম্মতদের সর্বদা দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে দুনিয়ায় সাদাসিধে জীবন যাপনের শিক্ষা দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (স.) আমার কাঁধে হাত রাখলেন এবং বললেন, তুমি দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন মুসাফির অথবা বিদেশি।

ইবনে উমর (রা.) বলতেন, ‘যখন সন্ধ্যায় উপনীত হবে তখন তোমরা সকালের অপেক্ষা করো না। আর যখন সকাল হয় তখন সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করো না। অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে কাজে লাগাও, আর তোমাদের মৃত্যুর জন্য জীবিতাবস্থায় পাথেয় জোগাড় করে নাও।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪১৬)

শেষ কথা হচ্ছে ‘পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কিছুই নয়’ (সূরা আলে ইমরান: ১৮৬)। আল্লাহ তাআলা সবাইকে বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।