‘আমাদের কষ্টের কথাগুলো প্রধানমন্ত্রীকে শোনাতে চাই’

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ঘটে ইতিহাসের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার ঘটনা। ভয়াল সেই হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতা-কর্মী নিহত হন, আহত হন প্রায় ৫০০ মানুষ।

তাদের সঙ্গে নিহত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেহরক্ষী মাহবুবুর রশিদ।

আজ ১৮ বছর অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু মাহবুবুরের পরিবারের খোঁজখবর নেয় না কেউ। এদিকে তার বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ভুগছেন। টাকার অভাবে ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

প্রতি মাসে কেমোথেরাপিসহ চিকিৎসা ব্যয় হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তার মা সন্তানের মৃত্যুবার্ষিকীও পালন করতে পারেননি।

একদিকে ছেলেকে হারিয়ে মাহবুবুরের বাবা-মা এখনো শোকে কাতর। অন্যদিকে সহায়-সম্বল বলতে তেমন কিছুই নেই। অভাব-অনটনও তাদের নিত্যসঙ্গী। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান মাহবুবুর রশিদের মা-বাবা। সে চেষ্টা তারা বছরের পর বছর ধরে করছেন। কিন্তু সে সুযোগ পাচ্ছেন না তারা।

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার জয়ন্তী হাজরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ফুলবাড়ী গ্রামের মোল্লাপাড়ার হারুন অর রশিদের (৭৫) ছেলে মাহবুবুর রশিদ।

পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজ। ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেহরক্ষী হিসেবে যোগদান করেন তিনি। এর আগে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ল্যান্স করপোরাল পদে কাজ করেছিলেন।

মাহবুবুর রশিদের অসুস্থ বৃদ্ধা মা হাসিনা বেগম বলেন, সব সময়ই ছেলের কথা মনে হয়, খুব কষ্ট হয়। ছেলে হারানোর যে কী বেদনা, যে হারায়, সে-ই বোঝে। আগে নিজেদের টাকায় ছেলের মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতাম। অর্থের অভাবে গত বছর ও এই বছর পালন করতে পারিনি।

ছেলের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের কেউ কোনো খোঁজখবর নেয়নি। বিভিন্ন রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে, হয়তো বেশি দিন বাঁচব না। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, মরার আগে সেই অপরাধীদের ফাঁসি চাই। আর প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার সুযোগ চাই।

তিনি আরও বলেন, টাকার অভাবে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছি না। ওষুধপথ্য কেনা ও সংসার চালাতে যে কী কষ্ট হচ্ছে, তা কেউ বুঝবে না। আমি ও আমার স্বামীর চিকিৎসার খরচ চলছে ধারদেনা করে। আমাদের কষ্টের কথাগুলো প্রধানমন্ত্রীকে শোনাতে চাই।

মাহবুবুর রশিদের সেজ ভাই ভ্যানচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার ভাইয়ের প্রধানমন্ত্রীর জন্য জীবন দিয়েছেন। তার নামে এলাকায় কোনো স্মৃতিচিহ্ন নাই। আমাদের খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আমাদের কোনো খোঁজখবরও নেন না। সেদিনের সেই নারকীয় ঘটনায় আমার ভাই জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ আমার ভাইকে মনে রাখেনি। ভাইয়ের নামে একটা প্রতিষ্ঠান করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

মাহবুবুর রশিদের বোন আবিদা সুলতানা ঢাকা পোস্টকে বলেন, মা-বাবাকে নিয়ে আমাদের খুব কষ্টে দিন কাটে। এক বছরের বেশি সময় ধরে বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত। ধারদেনা করে তার চিকিৎসা চলছে।

টাকায় অভাবে চিকিৎসা বন্ধ থাকে, উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। মায়ের শরীরেও নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। তাদের চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা দরকার। কিন্তু এত টাকা আমরা কোথায় পাব?

তিনি আরও বলেন, ভাবিও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না, গ্রামেও আসে না, কোনো ধরনের সাহায্যও করে না। আওয়ামী লীগের নেতারাও আমার অসুস্থ মা-বাবার খোঁজ নেন না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহযোগিতা চাই এবং তার সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমাদের কষ্টের কথাগুলো প্রধানমন্ত্রীকে শোনাতে চাই।

তিনি আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে যে টাকা দেয়, তা দিয়ে চলে না। তা ছাড়া করোনায় কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। সরকার সাহায্য করলে আমার ক্যানসারে আক্রান্ত বাবা ও মা ভালো থাকবেন।

মাহবুবুর রশিদের বাবা হারুন অর রশিদ বলেন, প্রতি মাসে ‘কল্যাণ ফান্ড’ থেকে যে টাকা দেওয়া হয়, তা দিয়ে কিছুই হয় না। টাকার অভাবে গত বছর ও এ বছর মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করতে পারিনি। আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না। ২১ আগস্ট এলে শুধু সাংবাদিকরা খোঁজ নেয়।

কিন্তু দিবসটি চলে গেলে সবাই ভুলে যায়। মৃত্যুর আগে ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই। আর প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার সুযোগ চাই, তার সাহায্য সহযোগিতা চাই।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, আওয়ামী লীগের সমাবেশে জীবন দিয়ে তার কী লাভ হলো! তার মৃত্যুবার্ষিকীতে কেউ তার খোঁজখবর নেয় না। সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, তার স্মৃতি রক্ষার জন্য যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হোক এই গ্রামে। তাহলে তার স্মৃতি রয়ে যাবে, তা না হলে একদিন তার স্মৃতি হারিয়ে যেতে পারে। তার অসুস্থ মা-বাবা খুব কষ্ট করছে। মাহবুবুর রশিদের স্ত্রীও তাদের খোঁজখবর নেন না।