ডিভাইস বসানো সেই পাখি সম্পর্কে যা জানা গেলো

কক্সবাজারের মহেশখালীতে পিঠে ডিভাইস বসানো উদ্ধার হওয়া পাখির খবর ইতিমধ্যে দেশে ভাইরাল হয়েছে। 

সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মহেশখালীর ধলঘাঁটার আট নম্বর ওয়ার্ডের একটি ব্রিজ থেকে পাখিটিকে উদ্ধার করেন স্থানীয় এক যুবক। 

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাখিটি মারা গেছে। ধলঘাটা ইউনিয়নের বিট কর্মকর্তা নুরুল আলম মিয়া একাত্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এদিকে পাখিটি নিয়ে যখন প্রচুর কৌতূহল ও রহস্য তখন এর খোঁজ করেছে একাত্তর। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পাখিটির আদ্যোপান্ত।

অনুসন্ধানে যা জানা গেলো

কক্সবাজারে ধরা পরা গায়ে ডিভাইস বসানো পাখিটির বাংলা নাম ‘কালো লেজ জৌরালি’ বা ‘Black-tailed Godwit’। মূলত এটি পরিযায়ী পাখি। নিদিষ্ট কিছু সময়ের জন্য তারা এক দেশে থেকে আরেক দেশে অবস্থান করে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক মূলত গবেষণার জন্য পাখিটির গায়ে ডিভাইস বসিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক ও গবেষক দীলিপ কুমার দাস জানান, পিএইচডি গবেষণার জন্য পাখিটির গায়ে ডিভাইস বসানো হয়েছিল।

তিনি বলেন, কালো লেজ জৌরালী পাখির বিভিন্ন দেশে পরিযায়নের পথ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্যই জিপিএস ডিভাইসটি বসানো হয়েছে। নিঝুম দ্বিপে ১০টি পাখির গায়ে এই যন্ত্রটি বসানো হয়েছে।

দীলিপ বলেন, কেন তারা শীতকালে বাংলাদেশে আসে সেই বিষয়টি জানতে পাখিটির গায়ে জিপিএস ট্রান্সমিটার বসানো হয়। কাজটি করা হয় ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর। পরে নিঝুম দ্বীপে পাখিটির গায়ে ডিভাইসটি বসিয়ে সুস্থ অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হয়।

তিনি জানান, ডিসেম্বরে ডিভাইস বসানোর পর এপ্রিল-মে মাস পর্যন্ত পাখিটি বাংলাদেশে উপকূল অঞ্চলেই বসবাস করে।

মে মাসের শেষের দিকে পাখিটি  ভারত, হিমালয়, তিব্বত হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চীনের বোহাই অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছায়। তারপর কিছু দিন চীনে অবস্থান করে পাখিটি আবারও বাংলাদেশে ফিরে আসে।

গবেষক জানান, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা পাখিটি ক্লান্ত হয়ে পরার কারণে কক্সবাজারে ওই জায়গায় বিশ্রাম নিচ্ছিলো।

তিনি জানান, পাখিগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো- এরা দুই-তিন মাসের বেশি সময় এক দেশ থাকে না। সাধারণত যে অঞ্চলে গরম বাড়তে থাকে তখন তারা এলাকাটি ছেড়ে শীত প্রধান অঞ্চলে আবাসস্থল খুঁজে নেয়। 

লেজ কালো জৌরালী পাখিটি রদ-জলাশয় অঞ্চল বসবাসের জন্য উপযোগী। যার কারণে বাংলাদেশে যখন এই পাখিগুলো আসে তখন উপকূল ও হাওড় অঞ্চলে অবস্থান করে।

গবেষক দীলিপ বলেন, এরা সাধারণ শামুক, ঝিনুক, কেঁচোসহ পানিতে থাকা ছোট ছোট বস্তুকণা খেয়ে বেঁচে থাকে। উপকূল ও হাওড় অঞ্চলে এসব খাদ্যের মজুদ বেশি থাকার পরিযায়ী এই পাখিরা পুরো শীতকাল এসব অঞ্চলে অবস্থান করে।

মূলত এসব পাখির উপস্থিতি থেকে বোঝায় যায় সেই এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশগত অবস্থা কেমন আছে।

পাখিটির গবেষক আরও জানান, এ পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওরে ১০টি ও নিঝুম দ্বীপে ১০টি পাখির গায়ে এই জিপিএস ডিভাইস বসানো হয়েছে। পাখিগুলো বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে।

তিনি বলেন, আগে বলা হলো- এই পাখিগুলো সাইবেরিয়া থেকে আসতো। কিন্তু এখন নতুন নতুন তথ্য মিলছে। জিপিএস ডিভাইসের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, রাশিয়া, কাজাকিস্থানের মতো দেশেও এই পাখিগুলোর বসবাসের মত উপযোগী পরিবেশ ও বাসস্থান রয়েছে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বাস করে পরিযায়ী এই পাখি শরীরে শক্তি জমায়। যখন তাদের প্রজননের সময় আসে তখন বিভিন্ন দেশে চলে যায়। মূলত পাখিরা ঘাস জাতীয় স্থানে বাসা বাধে ও বাচ্চা দেয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক জানান, পাখিগুলোর উপস্থিতির মাধ্যমে বোঝায় যায় হাওর ও উপকূলের পরিবেশ কতটা বসবাসের উপযোগী, এখানে পরিযায়ী পাখিদের পর্যাপ্ত খাবার আছে কিনা বা বসবাসের জন্য কতটা সহনশীল।

মূলত হাওর ও উপকূল অঞ্চল বন্যপ্রাণীর টিকে থাকার জন্য স্বাস্থ্যগত পরিবেশ ঠিক আছে কিনা তার ইন্ডিকেটর হিসাবে কাজ  করে পরিযায়ী পাখি। ডিভাইসের মাধ্যমে সেটি বোঝা যায়।

তিনি বলেন, আগের তুলনায় টাঙ্গুয়ার হাওর ও উপকূলে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে। পরিযায়ী এসব পাখির জন্য এসব অঞ্চলে পরিবেশ ঠিক রাখতে করণীয় বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে প্রাপ্ত ডিভাইসের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে। 

দীলিপ জানান, লেজ কালো জৌরালী পাখিটির নাম রাখা হয়েছে ‘ফিরোজ’। নামটি নেওয়া হয়েছে জাহাঙ্গীরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও বন্যপ্রাণি গবেষক অধ্যাপক মোস্তফা ফিরোজের নামের শেষের অংশ থেকে। 

অধ্যাপক ফিরোজ নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাখির গতিবিধি ও জীবন চক্র নিয়ে পিএইচডি করছেন বলেও জানান এই গবেষক।